দেবতার আশীর্বাদ আর হিমালয়ের মহিমায় এক অপূর্ব ভ্রমণ

পাহাড়ের রানী রানিখেত ড. সমুদ্র বসু উত্তরাখণ্ড, ভারতের উত্তর দিকে অবস্থিত এই ভূখণ্ডটি প্রাকৃতিক দৃশ্যের এক অভূতপূর্ব কোলাজ যার প্রতিটি শিরা-উপশিরায় বর্তমান অফুরন্ত মনোরম দৃশ্যপটের প্রাকৃতিক সম্ভার। কুমায়ুন সফরে গিয়ে আমার সেদিনের গন্তব্য ছিল আলমোড়া থেকে রানীক্ষেত। হিমালয়ের কোলে অবস্থিত এই ছোট্ট শহরটি উত্তরাখণ্ডের ছোট-বড় পাহাড় এবং উপত্যকা, বনাঞ্চলে ঘেরা। চারপাশের সৌন্দর্য বাড়িয়েছে নানারকম ফুল, সবুজ তৃণভূমি, পাইন, ওক, দেবদারু গাছ। বর্ষার সময় সবুজ বনাঞ্চলে ঘুরতে দারুণ লাগে। এই অঞ্চল চিতাবাঘ, বার্কিং ডিয়ার, পাহাড়ি ছাগল এবং লঙ্গুর-সহ বিস্তৃত বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল। যাঁরা শহরের কোলাহলমুখর জীবন থেকে কিছুদিনের জন্য ছুটি নিতে চান, তাঁদের জন্য আদর্শ জায়গা রানিখেত। এখানে আছে প্রচুর পর্যটন কেন্দ্র। সেগুলো অতি সুন্দর এবং মনোমুগ্ধকর। একদা দ্বারাহাটের রাজা সুধারদেবের [১১৮০ খ্রীষ্টাব্দ] রাণী পদ্মিনী তাঁর সখী এবং সান্ত্রীসহ শৈলভূমিতে ঘুরতে ঘুরতে বর্তমান রাণীক্ষেত ক্লাবের কাছে পৌঁছান। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং শীতল আবহাওয়ায় মুগ্ধ হয়ে গ্রীষ্মকালের কিছুটা সময় তিনি সেখানে থেকে যান। সেই জায়গাটার নাম হয় রাণীক্ষেত্র। আরও কিছুকাল পর থেকে রাণীর বিশ্রামক্ষেত্র লোকমুখে রাণীক্ষেত্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। সেখানকার প্রবীন মানুষদের কেউ কেউ আবার এই রানীক্ষেত নামের সঙ্গে রাণী পদ্মিনী কেন, অন্য কোন রাণীরই যোগাযোগ আছে বলে মনে করেন না। তাঁরা অবশ্য রাণীক্ষেত নামের প্রসঙ্গে অন্য একটা যুক্তি খাড়া করে থাকেন। তাঁরা মনে করেন রাণীক্ষেত নাম হয়েছে কুমায়ুনের এক কমিশনারের কন্যা অ্যানি কেট [Annie Kate] এর নাম থেকে। এই অ্যানি কেটের নাম থেকে জায়গাটা প্রথমে অ্যানিক্ষেত হয়। কালের গতিতে অ্যানিক্ষেত রাণীক্ষেতে পর্যবসিত হয়। প্রায় ৬,০০০ ফুট উঁচুতে ২১.৭৬ বর্গ কি.মি. জায়গা জুড়ে উত্তর ভারতের অন্যতম সুন্দর শৈল নিবাস এই রানীক্ষেত। পাইন, ওক, সিডার এবং সাইপ্রেস গাছের ছায়ায় গড়ে উঠেছে এই শৈল শহর। রাণীক্ষেত আধুনিকতার জালে আটকা পড়লেও সে তার শান্তি এবং অতীতের অনন্যপরতা বজায় রেখেছে। অন্যান্য পাহাড়ি শহরের মত রাণীক্ষেত কিন্তু ইট পাথরের জঙ্গল হয়ে ওঠেনি। পাহাড়ি শহরটা যেমন করেই হোক তার নিজস্ব সত্ত্বা এবং আদিম সৌন্দর্য নষ্ট হতে দেয়নি। সত্যি সত্যিই সবুজ গাছগাছালির মধ্যে শান্ত এবং নিরিবিলিতে বিশ্রাম নেবার আদর্শ স্থান। এখানে ঘর থেকে কিংবা গাছের ছায়ায় বসে উত্তরের বরফ ঢাকা পাহাড়ের দিক চেয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দেওয়া যায়। এখানকার সুন্দর এবং স্বাস্থ্যকর জলবায়ু সারা বছরই পর্যটকদের আকর্ষণ করে। রানীক্ষেত শহরে নৈনীতালের মত কোন হ্রদ নেই বটে তবে শহরের এক দিকে রয়েছে পাইন, দেবদারু, ওক গাছের জঙ্গল অন্য দিকে ১৫০ কি.মি. দীর্ঘ তুষারশুভ্র শৃঙ্গমালা। সকাল বেলায় রোদের পরশ লাগার আগে কিংবা বিকেলে শহর থেকে রোদ চলে যাবার বেশ কিছুক্ষণ পরেও তুষারময় শৃঙ্গগুলোয় চলে নানা রঙের হোলিখেলা। পর্যটকরা মোহিত হয়ে নানা রঙের খেলা দেখতে এখানে ছুটে আসেন। আর অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় মানুষরা কুমায়ুনের শহরাঞ্চল ছাড়িয়ে ছুটে চলেন শৃঙ্গজয়ের নেশায়। উত্তর দিকের দৃশ্যমান বরফাবৃত শৃঙ্গগুলোর মধ্যে অনেকগুলো শৃঙ্গ নৈনীতাল থেকে ঠিকমত চিনতে না পারলেও এখান থেকে তবু চেনা যায়। আবার কয়েকটা শৃঙ্গ আরও স্পষ্টভাবে চোখে ধরা দিচ্ছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে নন্দাঘুন্টি [২০,৭০০], হাতী [২২,০৭৪] ও ঘোড়ী [গৌরী] পর্বত [২০,৫০০]। নন্দাঘুন্টি ভারতের প্রথম বেসরকারি পর্বতাভিযান হিসেবে চিহ্নিত। ১৯৬০ খ্রীষ্টাব্দে ২২শে অক্টোবর সুকুমার রায় ও দিলীপ ব্যানার্জি চারজন শেরপা সহ নন্দাঘুন্টি শৃঙ্গ জয় করেন। এভারেস্ট বিজয়ী সোনাম গিয়াসার নেতৃত্বে ভারতীয় অভিযাত্রীরা হাতী পর্বতে আরোহণ করেন ১৯৬৩ খ্রীষ্টাব্দের ৬ই জুন। এর প্রায় ৩০ বছর পর কলকাতার ১৮ জন সদস্যের একটা দল হাতী পর্বত অভিযানে আসেন। দলটির নেতৃত্বে ছিলেন প্রখ্যাত পর্বতারোহী অমূল্য সেন। দলে ছিলেন খ্যাতনামা ভ্রমণ সাহিত্যিক শঙ্কু মহারাজ। দলের সদস্যরা হাতী পর্বত আরোহণে বিফল হলেও পাশের ২০,৩০০ উচ্চতার অনামা শৃঙ্গ জয় করেন। বহুদিন আগে ১৯৩৬ খ্রীষ্টাব্দে প্রথম নন্দাদেবী অভিযান এই রাণীক্ষেত থেকে শুরু হয়েছিল। সেবার এইচ, ডবলু, টিলম্যান ও এন.ই.অডেল এখানে বসেই তাঁদের নন্দাদেবী শৃঙ্গে আরোহণ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ করেন। বড়লাট লর্ড মেয়ো [১৮৬৮-৭২] কিছুকাল রাণীক্ষেতে বাস করে এখানকার সুন্দর আবাহাওয়া ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে বিভোর হয়ে তিনি তাঁর শৈলাবাস এবং সেনাবাহিনীর সদর দপ্তর সিমলা থেকে এখানে সরিয়ে নিয়ে আসতে মনস্থ করেন। সে সময় রানীক্ষেত ছিল চাঁদ রাজাদের অধীনস্থ পালি পরগণার রাজাদের রাজধানী। ১৮৬৯ খ্রীষ্টাব্দে ইংরাজরা সারণা, কোটলী, রানীক্ষেত এবং তানা নামের গ্রাম ক'টা ১৩,০২৪ টাকায় কিনে নিয়ে তাঁরা এই শহরটার পত্তন করেন। ঐ বছরের ১লা এপ্রিল এখানে খাজাঞ্চীখানা চালু হয়। লর্ড মেয়ো রামনগর থেকে রাণীক্ষেত পর্যন্ত রেল চলাচলের জন্যে জরীপকার্যের আদেশ দেন। দুর্ভাগ্যের ব্যাপার তাঁর আকস্মিক মৃত্যুর ফলে সেই জরীপের কাজ আর কার্যকরী হয় নি। রেললাইন পাতার ব্যাপারটা ধামাচাপা পড়ে গেলেও রানীক্ষেত জায়গাটা কিন্তু ইংরাজদের খুবই পছন্দ হয়। তাদের হাতে জায়গাটা গড়ে উঠতে থাকে। ইংরাজরা গ্রামগুলো কিনে নেওয়ার পর তাঁরা সেখানকার লোকেদের সরিয়ে দিয়ে জায়গাটা মোটামুটি সমতল করে ক্যান্টনমেন্ট তৈরী করেন। ১৮৭১ খ্রীষ্টাব্দে এখানে ক্যান্টনমেন্ট কমিটি তৈরী হয়। তারাই এখানকার জল নিকাশি ব্যবস্থা এবং পানীয় জলের বন্দোবস্ত করেন। বর্তমানে রাণীক্ষেত শুধুমাত্র সেনানিবাস নয় কুমায়ুন রেজিমেন্টের সদর দপ্তর বটে। মোটামুটি ১৮১৬ সালের পূর্বে রানীক্ষেত নেপালী শাসনাধীন ছিল বলে জানা যায়। এরপরে কুমায়ুন অঞ্চলের মানুষের সহযোগিতায় ব্রিটিশরা রানীক্ষেতকে ভারতের অধীনে নিয়ে আসে। অর্থাৎ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়েছিল। রানিখেতে যা যা দর্শনীয় স্থান আছে সবার সুবিধের জন্য সেটার একটা তালিকা করে দিলাম- ১) চৌবাটিয়া বাগান শহরের কেন্দ্র থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত চৌবাটিয়া বাগান। বাস বা ট্যাক্সিতে পৌঁছনো যায়। এই বাগানে দেখা যায় নানারকমের ফুল। এখান থেকে চোখে পড়ে হিমালয় পর্বতশৃঙ্গ নন্দা দেবী এবং ত্রিশূল পর্বতমালা। ২) আশিয়ানা পার্ক রানিখেতে খোলা প্রথম থিম পার্ক হল আশিয়ানা পার্ক। দেবদার উদ্যান নামেও পরিচিত। এটা রানিখেতের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত। শিশুদের মনোরঞ্জনের জন্য রয়েছে বিভিন্ন উপাদান। আছে এন্ট্রি ফি। গেমস এবং বোটিংয়ের জন্য অতিরিক্ত ফি দিতে হয়। ৩) রানি ঝিল রানি ঝিল ভারতীয় সেনাবাহিনীর ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের উদ্যোগে বৃষ্টির জল সংগ্রহের জলাধার হিসেবে নির্মিত। এখানে অনেকেই পিকনিক করেন। ঝিলে বোলিংয়ের ব্যবস্থা রয়েছে। ৪) ভালু বাঁধ ভালু বাঁধ রানিখেতের একটি দুর্দান্ত জায়গা। এটা শহরের কেন্দ্র থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। বাস বা ট্যাক্সিতে পৌঁছনো যায়। জায়গাটা ছবির মতো সুন্দর। ৫) সানসেট পয়েন্ট শহরের কেন্দ্র থেকে মাত্র ৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত সানসেট পয়েন্ট হল রানিখেতের জনপ্রিয় পর্যটন স্থানগুলির মধ্যে অন্যতম। সূর্যাস্ত দেখার পাশাপাশি হিমালয়ের শীতল বাতাস গায়ে মাখার জন্য বহু মানুষ এখানে আসেন। ৬) মাজখালি মাজখালির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অতি মনোরম। রানিখেত থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। যেদিকে চোখ যায় শুধু সবুজ আর সবুজ। সারা বছর বহু পর্যটক ভিড় জমান। বেশি ভিড় হয় বৃষ্টিদিনে। বর্ষায় এলাকা সেজে ওঠে অন্যরকম সাজে। ৭) ম্যানিলা গ্রাম শহরের কেন্দ্র থেকে মাত্র ৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ম্যানিলা গ্রাম। একটি নিরিবিলি জায়গা। রানিখেত থেকে বাস বা গাড়িতে যাওয়া যায়। অসাধারণ প্রাকৃতিক পরিবেশ। এখানকার আকর্ষণীয় জায়গা কৃত্রিম হ্রদ কায়াকিং। ধানের খেত দেবে চোখের আরাম। ৮) মিউজিয়াম কুমায়ুন রেজিমেন্টাল সেন্টার মিউজিয়ামটি ইতিহাসপ্রেমী এবং পর্যটকদের পরিদর্শন করা আবশ্যক। এটা শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত এবং পাবলিক ট্রান্সপোর্টের মাধ্যমে সহজেই পৌঁছনো যায়। প্রবেশ ফি আছে। সাতের দশকের গোড়ায় ভারতীয় সেনাবাহিনীর কুমায়ুন রেজিমেন্ট এই মিউজিয়ামটি প্রতিষ্ঠা করেছিল। এখানে দেখা যায় ভারতীয় সেনাবাহিনীর কুমায়ুন এবং গাড়ওয়াল রেজিমেন্টের যুদ্ধ নিদর্শন। ৯) সদর বাজার রানিখেতের সদর বাজার তাজা পণ্য, মশলা এবং হস্তনির্মিত পণ্যের জন্য পরিচিত। বাজারটি শহরের কেন্দ্রের ঠিক বাইরে অবস্থিত। পায়ে হেঁটে বা পাবলিক ট্রান্সপোর্টে পৌঁছনো যায়। এখান থেকে কেনা যায় স্মারক এবং উপহার। ১০) আপেল বাগান আপেল বাগান একটি দুর্দান্ত বেড়ানোর জায়গা। শহরের কেন্দ্র থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। বাস বা ট্যাক্সি নিয়ে পৌঁছনো যায়। বহু পর্যটক ভিড় জমান। ১১) ঝুলা দেবীর মন্দির আমরা আলমোড়া থেকে গাড়িতে গেছিলাম রানীক্ষেত। সময় নিয়েছিল ঘন্টা দেড়েক। মিলিটারি ব্যারাককে বাম দিকে রেখে এরপর দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আমরা রানীক্ষেতের ঝুলাদেবী মন্দির প্রাঙ্গনে এসে পৌঁছেছিলাম। ঘন পাইন এবং চির গাছের জঙ্গলের মধ্যে সুন্দর ও প্রসিদ্ধ এই মন্দিরটি অবস্থিত। মন্দিরের বাইরে জুতা, মোজা খুলে মন্দিরের সিংহদ্বারের বাইরে একটিমাত্র পূজার ডালির দোকান থেকে কিনলাম লাল চূর্ণী, ফুল, শুকনো প্রসাদ, ধুপ, দীপ আর একটা ছোট ঘন্টা। এখানে মাকে ঘন্টা নিবেদন করে পুজো দিতে হয়। আমরা মন্দিরের প্রবেশদ্বার দিয়ে প্রবেশ করে মাতৃ দর্শন করলাম। মন্দিরের প্রবেশ পথ থেকে মন্দির পর্যন্ত বাঁদরের জন্য জাল দিয়ে ঘেরা রয়েছে। বিভিন্ন অলঙ্কারে সজ্জিত মায়ের মূর্তি দর্শন করে মন প্রফুল্লিত হল। অতীব সুন্দর মূর্তি। প্রথম দেখাতেই সমতার এই মন্দিরটি বেশ ভালো লেগেছে। মন্দির চত্বরটি বেশ বড়। আনুমানিক সাতশ বছরের পুরানো এই মন্দির অর্থাৎ ব্রিটিশরা এদেশে আসার আগেই এই মন্দিরটি ছিল। রানী ক্ষেত ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় সেই মন্দিরটি নবরূপে সজ্জিত হয়েছে। স্থানীয় কিংবদন্তি বহু বছর পূর্বে বর্তমান আলমোড়া জেলার এই এলাকা গভীর জঙ্গলে পরিপূর্ণ ছিল। পাইন ও চির গাছের এই জঙ্গলে গো-খাদ্যের উপযোগী বিভিন্ন ঘাস সেসময় জন্মাত। এখনও জন্মায়। ফলে এখান থেকে দেড় কিমি দূরে অবস্থিত বর্তমান তারিক্ষেত ব্লকের পিলখালী গ্রামের কৃষিজীবী মানুষেরা গবাদি পশু নিয়ে এই এলাকায় পশুচারণে আসতেন। সেই সময় প্রায় দিনই কোন না কোন গরু বাঘের পেটে চলে যেত। অনেক মানুষরও মৃত্যু হয়েছে বাঘের কামড়ে। উত্তরাখন্ডের এই এলাকায় সেই সময় দিনের বেলাতেও মানুষের আনাগোনা ছিল নগন্য। এমন সময় একদিন গ্রামেরই একজন ব্যক্তি দেবী দুর্গার স্বপ্নাদেশ পেলেন, জঙ্গলের এই এলাকায় একটি মাতৃমূর্তি রয়েছে। সেই মূর্তি খুঁজে বের করে মূর্তির পূজা অর্চনা শুরু করলে এই এলাকার মানুষ বাঘের ভয় মুক্ত হবেন। গ্রামবাসীরা এরপর জঙ্গলে সেই মূর্তির খোঁজ শুরু করলে, গভীর জঙ্গল পরিবেষ্টিত ভূগর্ভস্থ এই স্থান থেকে মাতৃ মূর্তিটির সন্ধান পেলেন। এরপর শুরু হলো মূর্তিটির পূজা অর্চনা। মন্দিরের পণ্ডিতজি বললেন, সেই থেকেই এই এলাকায় কখনো বাঘ বা কন্য অন্যান্য পশুরা, গবাদি পশু বা মানুষের উপর আক্রমণ করে না। তিনি বললেন এই ঝুলাদেবী আসলে দেবী দুর্গা। মন্দির দর্শন করে সফেরার তোড়জোড় করছি, এমন সময় হঠাৎই আমার জানতে ইচ্ছা হলো, দেবী দুর্গা কেন এখানে ঝুলা দেবী নামে পূজিত হন? পণ্ডিতজি বললেন, "গ্রামের মানুষ গরু চরাতে এসে এখানে দীর্ঘ সময় বুলনায় দোল খেত, খেলা করত। এই দেখে একদিন মায়ের ও সাধ হয়, তিনিও ঝুলনায় দোল খাবেন। দেবী, গ্রামবাসীদের একজনকে স্বপ্নাদেশ করলেন, তিনিও খুলনায় দোল খাবেন। গ্রামবাসীরা এরপর মাকে একটি কাঠের তৈরী দোলনায় প্রতিষ্ঠা করলেন।" সেই থেকেই দেবীর নাম 'ঝুলাদেবী'। এইই কিংবদন্তি। বিশ্বাস বা অবিশ্বাস পাঠকের ব্যক্তিগত বিষয়। তবে স্থানীয় মানুষের এই বিশ্বাসের উপর আঘাত করার ইচ্ছা আমার হয়নি। রূপকথার গল্পের মত আমি মন দিয়ে ঝুলাদেবীর এই কাহিনী শুনেছি। সে কথাই আজ লিখলাম। সমগ্র দেশজুড়ে এমন অসংখ্য গল্প কান পাতলেই শোনা যায়। এইভাবেই বিবিধ এলাকায় লৌকিক দেবদেবীর সৃষ্টি হয়। তাঁরা পূজিত হন। মানুষ বিশ্বাস করেন। অনেকেই বিশ্বাস করেন না। এই দেবদেবীদের পুজা উপলক্ষে বছরের বিশেষ বিশেষ দিনে মেলা বসে। শুনলাম, দশেরার সময় এই ঝুলা দেবীর মন্দির প্রাঙ্গনে বড় মেলা হয়। দূরদুরান্ত থেকে অনেক মানুষ তখন এখানে আসেন। তাঁরা তাদের মনস্কামনা ঈশ্বরকে জানান, সেই মনস্কামনা পূর্ণ হলে ভক্তরা মন্দিরে ঘন্টা বেঁধে যান। মন্দির চত্বরে প্রবেশ করে অসংখ্য সেই সব ঘণ্টা খুলতে দেখলাম। এত এত ঘন্টা এর আগে আলমোড়ার গলু দেবতা মন্দির ছাড়া আমি অন্য কোন মন্দিরে দেখিনি। ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে বেড়ালে ভারতের এই আত্মাকে খুঁজে পাওয়া যায়। পৃথিবীতে ভারতবর্ষই তো এক অনন্য জায়গা যেখানে প্রকৃতির যে কোনো রূপকে ঐশী রূপে আরাধনা করা হয়। পথনির্দেশ- দেরাদুন বিমানবন্দরে নেমে বাস বা গাড়িতে যেতে হয়। ট্রেনে হাওড়া-কাঠগোদাম এক্সপ্রেসে কাঠগোদাম। সেখান থেকে গাড়িতে নৈনিতাল হয়ে রানিখেত। এছাড়া কাঠগোদাম থেকে ছাড়া বাস রানিখেতে নিয়ে যায়।

ড. সমুদ্র বসু।

9/15/20261 min read