ডানলপ ব্রিজ থেকে মায়াপুর সফর*

*গঙ্গার ধার ঘেঁষে: ডানলপ ব্রিজ থেকে মায়াপুর সফর* - অভিজিৎ মজুমদার -------------- সকাল দশটা নাগাদ কলকাতার ডানলপ ব্রিজ এলাকা থেকে ক্রিকেটার অজয়, মেরিন ইঞ্জিনিয়ার রঙ্গন আর আমি, স্কুলের তিন বন্ধুর যাত্রা শুরু হলো। দক্ষিণেশ্বর থেকে নিবেদিতা সেতু বা দ্বিতীয় বিবেকানন্দ টোল ব্রিজ পেরিয়ে আমরা দিল্লি রোডের মসৃণ পথ ধরলাম। গাড়ি ব্যারাকপুর, পলতা, মগরা পেরিয়ে বৈঁচির শান্ত সবুজ প্রকৃতির বুক চিরে ছুটল। মনে এক অদ্ভুত মুক্তির আমেজ। গন্তব্য *কালনা*। গুপ্তিপাড়ার বাঁকগুলো পেরিয়ে কালনা শহরে ঢোকার মুখেই পড়ল *“চক্রবর্তী হোটেল”*। দুপুরের খাওয়া সারলাম ঘরোয়া ডাল, সবজি আর দেশী পাঁঠার মাংস দিয়ে, সিমপ্লি অসাধারণ। বহু দিন পর এত ভালো ডাল আর আলু-পটলের ডালনা খেয়ে ছোটবেলার স্বাদ ফিরে পেলাম। মন্দিরগুলো ঘণ্টা দেড়েক পর খুলবে, তাই লঞ্চে চড়ে শান্ত শীতল হাওয়ায় গঙ্গা পেরিয়ে ওপারে *নৃসিংহপুর ঘাট, শান্তিপুরে* চলে গেলাম। ওখানে এক চায়ের দোকানে বসে এক কাপ চা খেয়ে আবার ফিরে আসা। এরপর *কালনা দর্শন*। আমাদের প্রথম গন্তব্য ছিল ঐতিহাসিক *"গৌরীদাস পণ্ডিতের শ্রীপাট (মহাপ্রভু বাড়ি)"*। এখানে শ্রীচৈতন্যদেবের ব্যবহৃত খড়ম এবং গৌরীদাস পণ্ডিতের হাতে লেখা গীতা আজও পরম যত্নে সংরক্ষিত আছে। এই মন্দিরে মহাপ্রভুর সেই নিমকাঠের দারুবিগ্রহ রয়েছে, যা তাঁর স্ত্রী বিষ্ণুপ্রিয়া দেবী নিজে পূজা করতেন। পরবর্তী গন্তব্য এখানকার প্রধান আকর্ষণ *"১০৮ শিব মন্দির"*, যা ১৮০৯ সালে বর্ধমানের মহারাজা তেজচন্দ্র নির্মাণ করেছিলেন। *জপমালা*-র আদলে সাজানো এই মন্দিরের বাইরের বৃত্তে ৭৪টি এবং ভেতরের বৃত্তে ৩৪টি মন্দির রয়েছে। এই ১০৮টি মন্দিরের প্রতিটিতেই একটি করে শিবলিঙ্গ রয়েছে। সদাশিবের প্রতীক হিসেবে ভেতরের বৃত্তের প্রতিটি শিবলিঙ্গ সাদা, অপরদিকে রুদ্রের প্রতীক বাইরের বৃত্তের শিবলিঙ্গের অর্ধেক কালো এবং বাকি অর্ধেক সাদা। শিবলিঙ্গগুলি, বিভিন্ন কোনে ঘোরানো। বাইরের বৃত্তের পশ্চিম দিকে একটি অতিরিক্ত মন্দির সহ দুটি বৃত্ত গঠনকারী ১০৮টি মন্দিরই *আটচালা স্থাপত্যশৈলীতে* নির্মিত। বাইরের বৃত্তের পশ্চিম দিকের মন্দিরটি *পঞ্চরত্ন শৈলী*-তে নির্মিত, যেখানে একটি আট ধাপের বারান্দা রয়েছে। এই মন্দিরের বর্তমান নাম *জলেশ্বর মন্দির*। দুটি বৃত্তের মাঝখানে একটি ব্যবহারযোগ্য কূপ রয়েছে, যা পূজার জন্য মন্দিরের জলের চাহিদা মেটায়। ১০৮ শিব মন্দিরের ঠিক উল্টোদিকেই রাজকীয় *"বিজয় বৈদ্যনাথ মন্দির"*। ১৭৬৪ সালে বর্ধমানের মহারাজা তিলকচাঁদ তাঁর মা মহারানি লক্ষ্মীকুমারীর ইচ্ছেপূরণের জন্য এই মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন। পোড়ামাটির অলঙ্করণে — লঙ্কাযুদ্ধের দৃশ্য থেকে শুরু করে শিকার আর সামাজিক জীবনের যে ছবিগুলো ইটের গায়ে খোদাই করা আছে, সেগুলো যেন ইতিহাসের এক একটা জীবন্ত পাতা। *"প্রতাপেশ্বর মন্দির"* টা ঠিক ১০৮ শিব মন্দিরের উল্টোদিকেই, কালনা রাজবাড়ী চত্বরের ভেতরেই অবস্থিত। রাজবাড়ী চত্বরে ঢুকলেই একদম বাঁ দিকে এই সুন্দর ছোট মন্দিরটা। কালনার বাকি মন্দিরগুলো যেমন 'চালা' বা 'রত্ন' স্টাইলের, প্রতাপেশ্বর মন্দিরটি কিন্তু ওড়িশার মন্দিরের মতো লম্বাটে *"রেখ দেউল"* স্থাপত্যে তৈরি। ১৮৪৯ সালে বর্ধমানের রাজা প্রতাপচাঁদের স্মৃতিরক্ষায় তাঁর প্রথম স্ত্রী মহারাণী পিয়ারীকুমারী দেবী এটি নির্মাণ করিয়েছিলেন। মন্দিরের গায়ে যে পোড়ামাটির কাজ আছে, তা কালনার মধ্যে সবথেকে সূক্ষ্ম আর উন্নতমানের। লঙ্কার যুদ্ধের দৃশ্য, মা দুর্গার মহিষাসুরমর্দিনী রূপ থেকে শুরু করে শ্রীকৃষ্ণের রাসলীলা—প্রতিটি ইটের গায়ে ইতিহাসের শিল্প নিখুঁতভাবে ফুটে উঠেছে। এরপর গেলাম *"ভবা পাগলা"*-র আশ্রমে। প্রখ্যাত সাধক ও লোকসঙ্গীত রচয়িতা ভবা পাগলার এই সাধনপিঠ গঙ্গার ঠিক পাশেই অবস্থিত। আশ্রমের ভেতরে ভবার শয়নকক্ষ, সমাধি, শৈবলিনী মন্দির, ভবানী মায়ের রান্নাঘর, পাগলী মায়ের ভান্ডার। আশ্রমের পাশ দিয়েই বয়ে চলেছে গঙ্গা। এরপর অম্বিকা কালনা মন্দির অনন্ত বাসুদেব ইত্যাদি দেখে বিকেল ছটা নাগাদ গাড়ি নিয়ে আমরা রওনা দিলাম নবদ্বীপের উদ্দেশ্যে। ঘন্টাখানেক পর নানা অলিগলি ঘুরে দেখে শেষে রাতে গঙ্গার কাছেই ড্রিমল্যান্ড হোটেলে বিশ্রাম। পরের দিন সকালে নবদ্বীপের কয়েকটা বিশেষ স্থান, যেমন— *"ধামেশ্বর মহাপ্রভু মন্দির"* দর্শন করলাম। এখানকার বিশেষত্ব হলো মহাপ্রভুর *"ঝলক দর্শন"* এখানে বিগ্রহের সামনে পর্দা সবসময় টেনে রাখা হয়। ভক্তদের অনুরোধে খুব অল্প সময়ের জন্য পর্দা সরিয়ে বিগ্রহের 'ঝলক দর্শন' করানো হয়। বিশ্বাস করা হয়, বেশিক্ষণ পর্দা খোলা রাখলে বিগ্রহদ্বয় আবার জীবন্ত হয়ে চলতে শুরু করতে পারেন। এরপর গেলাম *প্রাচীন মায়াপুর* -- অনেকের বিশ্বাস, ভাগীরথীর পশ্চিম তীরে নবদ্বীপের এই অংশেই মহাপ্রভুর আদি জন্মভিটে ছিল। এখানে একটি প্রাচীন নিম গাছ এবং একটি ছোট মন্দির রয়েছে যা তাঁর আবির্ভাবের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এরপর *রাধারাণীর মন্দির* দর্শন সেরে আমাদের পরবর্তী গন্তব্য ছিল *মায়াপুর*। এগারোটা নাগাদ পৌঁছলাম। *ইসকনের চন্দ্রোদয় মন্দির*-এর বিশালতা আর পবিত্র পরিবেশ মন ভরিয়ে দেয়। সেখানে মাত্র আশি টাকায় পাওয়া দুপুরের প্রসাদ ছিল আক্ষরিক অর্থেই অমৃততুল্য। বিকেলের আলোয় মায়াপুর ছাড়িয়ে ফেরার পথে গাড়ি থামল *কৃষ্ণনগরে*। ঐতিহাসিক *কৃষ্ণনগর রাজবাড়ী* দেখে সোজা বিখ্যাত মিষ্টির দোকান *"অধর চন্দ্র দাস”* থেকে সরপুরিয়া ও সরভাজা কেনা হলো। ফেরার পথে গাড়ির জানলা দিয়ে আসা হাওয়ায় যেন মিশে ছিল গঙ্গার ঘ্রাণ, কালনার মন্দিরের প্রাচীনত্ব আর কৃষ্ণনগরের মিষ্টির সুবাস। সব মিলিয়ে এই সফরটি ছিল এক নিবিড় প্রশান্তি আর ঐতিহ্যের মেলবন্ধন। কলমেঃ- অভিজিৎ মজুমদার

অভিজিৎ মজুমদার

6/23/20261 min read