

মনের কোণে কলমে
মনের কোণে কলমে __ সোমা দে চায়ের নেশা আমার তেমন নেই । সকাল থেকে কাজের চাপ এতটা বেশি যে স্নান করতে অনেক বেলা হয়ে গেল । স্নানের পর শরীরটা কেমন যেন ম্যাজম্যাজ করছিল । এলোচুলে ব্যালকনিতে বসে চায়ের কাপে চুমুক দিতে বেশ লাগছিলো আমার । ওদিকে সূর্যদেব তার বিদায়ের শেষ বার্তা দিচ্ছিল । পড়ন্ত বিকেলে যখন লাল টুকটুকে সূর্য আস্তে আস্তে তার সমস্ত কিরন নিঃশেষ করে বিদায়ের জন্য প্রস্তুত হয় বেশ লাগে মৃদু মন্দ হাওয়ার আগমনে । মাথাটা ও আজ বেশ ধরে আছে । একা একা চা পান করতে তেমন ভালো লাগে না । কিন্তু কি করা ! সুমন্ত তো আর এই সময় বাড়িতে থাকে না ।বিকালের সময় টা এইভাবে চাঁপার আলস্যে কাটে । মনের কোণে জমা হয় কত যে কথা । সারা দিনের কাজের শেষে আমার এইটুকু ফুসরত । কখনও মনে পড়ে যায় সেই ছোটো বেলার কথা । আবার কখনও চাঁপা নামের কত রকমের মানে সবাই বলতো সেইসব কথা ।কেউ বলতো তোর গায়ের রঙ চাপা তাই তোর নাম রাখা হয়েছে চাঁপা । পাড়ার উকিল দাদু যাকে আমি হিরন দাদু ডাকতাম তিনি শুধু বলতেন নারে ভাই তোর নাম হল সুন্দর একটা ফুলের নাম । তার নামও চাঁপা । সুন্দর গন্ধ আছে । সুন্দর সাদা বর্নের ফুল । দাদু কোর্ট থেকে আসার পথে প্রায়ই আমাকে চাঁপা ফুল এনে দিতেন । আর বলতেন কখনো মন খারাপ করবি না । যে যা বলে বলুক । কারো কথায় কান দিবি না ।প্রতিদিন এইভাবে ভাবতে ভাবতে কখন যে সন্ধ্যা হয়ে যায় আজকাল কিছুই যেন ভালো লাগে না । কিছুক্ষনের মধ্যেই ছেলে ঘুম থেকে উঠবে । ঈষদুষ্ণ জলে কমপ্লান গুলতে গুলতে সব কাজের হিসাব গুলো করে নিতে হয় । ছেলের Health drinks খাওয়া শেষ হলে পড়তে বসানো । এটা প্রতিদিনের নিয়ম । দেখতে দেখতে ক্লাস থ্রী হয়ে গেল অনির । এই তো সেইদিনের কথা অনি হল । এখন অনির আট বছর । সময় কারো জন্য বসে থাকে না । অনি খুব দুস্টু । সারাদিন তার দুস্টুমিতে আমার বেশ কেটে যায় । আমরা দুজন সারাদিন হৈ হুল্লোড় করে কাটায় । দিনটা যে কখন গড়িয়ে রাত হয়ে যায় আমরা বুঝতে ও পারিনা । রাতে সুমন্ত বাড়ি এলে নানা গল্প আর তিন জনের আড্ডা তে আমাদের শুতে শুতে অনেক রাত হয়ে যায় । আবার পরের দিন সকালে উঠতে হয় । আমার সকাল টা যায় যুদ্ধ করে । সকালের রান্না, টিফিন বানানো । কারন দুজনের ই তাড়া থাকে । বাবার অফিস যাওয়ার তাড়া ছেলের স্কুল যাওয়ার তাড়া । দুজনকে রওনা করে দিয়ে নিজে খেয়ে নিই । তারপর আবার দুপুরের রান্না শুরু হয় । রান্না শেষ করে প্রতিদিনের কিছু না কিছু জামা কাপড় পরিস্কারের কাজ থাকে । তারপর স্নান সেরে উঠতে উঠতে অনি স্কুল থেকে বাড়ি ফেরে । মা - ছেলে খেতে বসে চলে একটু স্কুলের গল্প । খাওয়া শেষে অনিকে ঘুম পাড়াতে গিয়ে নিজের চোখ টাও কেমন যেন ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে আসে । তাই একটু ঘুমিয়ে নিই এতে সারাদিনের ক্লান্তি বেশ কিছুটা লাঘব হয় । বয়স তো আর কম হল না তাই এখন একটুতেই কেমন যেন ক্লান্তি আসে । তাছাড়া পরিশ্রমের ধকল তো আছেই । দেখতে দেখতে জীবনের ছত্রিশ টা বছর পার করতে চললাম । কত ভালই না ছিল পুরনো সেই দিন গুলো । সুমন্তের সাথে আমার প্রথম আলাপ ট্রেনে । প্রথম ও শেষবারের মত দার্জিলিং ভ্রমনের সময় । কলেজের বন্ধুরা মিলে হঠাৎই ঠিক করেছিলো ওরা গরমের ছুটিতে দার্জিলিং যাবে । মেধাবী ছাত্র হিসাবে সুমন্তের টিউশনির বাজার বেশ ভালো ছিল । সে যাই হোক , বন্ধুরা মিলে শিয়ালদা স্টেশন থেকে ট্রেনে করে নিউ জলপাইগুড়ি তারপর সেখান থেকে বিস্ময়কর টয় ট্রেনে উঠে সোজা দার্জিলিং পৌঁছানো । কী দারুন উত্তেজনা দেহে মনে!অফিস যাবার সময় গাড়ির মধ্যে সুমন্ত ও বহুবার চোখ বন্ধ করে ভেবেছে । পুরনো স্মৃতি রোমন্থন করতে বেশ লাগে । ট্রেনের কথায় আচমকা মনে পড়ে গেল চাঁপার সাথে প্রথম আলাপের কথা । নড়েচড়ে বসলো সুমন্ত । চোখ মেলে দেখলো মেঘগুলো একই রকম আছে । আবার চোখ বন্ধ করে সুমন্ত ডুব দিল স্মৃতির সাগরে । সেই টয় ট্রেনে করে প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্রীদের একটা দলও যাচ্ছিল । কতজন ছিল সেই দলে আজ আর মনে নেই সুমন্তের । তবে দুজন অধ্যাপিকা ছিলেন ছাত্রীদের তত্বাবধানে । তাঁদের একজনের কঠোর মুখ সুমন্তের আবছা মনে পড়ল । চাঁপা সব মেয়েদের মধ্যে শান্ত আর লাজুক প্রকৃতির ছিল । ট্রেনে তার সঙ্গে অনেকবার চোখাচোখি হয়েছিল সুমন্তের ।সুমন্ত তার দিকে তাকিয়ে হাসার সাহস পায়নি । ক্যালকাটা ইউনিভর্সিটি তে মেয়েদের সাথে পড়লে ও সুমন্তের মধ্যে একটা গ্রাম্য আড়ষ্টতা বরাবরই রয়ে গিয়েছিল । যেন নিজেকে নিয়ে সঙ্কোচ । কোনো কারণ নেই অথচ সেটাই মনের অজান্তে হয়ে উঠেছিল সবচেয়ে বড় বাধা । সারা ট্রেনে সুমন্ত লাজুক -গোপন দৃষ্টিতে চাঁপা কে দেখেছিল । মনে মনে তার সঙ্গে পরিচয় করেছিল , অথচ সোজা চোখে বেশিক্ষন তাকিয়ে থাকার সাহস হয়নি । আলাপের চেষ্টা করা তাে দূরের কথা ।দার্জিলিং -এ সেবার ওরা কাছাকাছি গেস্ট হাউজে উঠেছিল । দার্জিলিং এ হারিয়ে যাওয়ার কোনো উপায় নেই । হারিয়ে যাওয়া সব কিছুই ম্যালে ফিরে আসে । গেস্ট হাউজ কাছাকাছি হলেও দূরত্ব যে ছিলো না তা নয় । তাই দেখা হবার কোনো সুযোগ ছিল না । তাই ম্যালে কয়েকবার কেন বহুবার সুমন্ত চাঁপা কে দেখেছে । চাঁপা ও সব ইন্দ্রিয় দিয়ে বুঝতে পেরেছে কার চোখ তাকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে ঘিরে রেখেছে । কয়েক দিন পর ম্যালে হঠাৎ ই এক পশলা বৃষ্টি শুরু হয়েছিল । সবাই দৌড়ে কোনও না কোনো আশ্রয়ের দিকে ছুটেছিল তেমনই সুমন্ত চাঁপা কে একাকী পেয়েছিল এমনই এক আশ্রয়ে । বহু মানুষের নানা কথার মাঝে সাহস করে জিজ্ঞেস করেছিল সুমন্ত ' আপনারা কোন কলেজে পড়েন ? ' কিছুটা সঙ্কোচ , অস্বস্তি ও জড়তা নিয়ে চাঁপা বলেছিল প্রেসিডেন্সি কলেজ । আপনি ? ' ' কলকাতা ইউনিভর্সিটিতে geography নিয়ে পড়ছি । আপনি কী পড়েন ? ' ' সেকেন্ড ইয়ার bengali অনার্স । ' ' আমি সুমন্ত বসু । ' ' চাঁপা পাল । ' আলাপের প্রথম ধাক্কাটা এতো সহজ ভাবে ঘটে যাবে , সুমন্তের ধারনার বাইরে ছিল ।কিন্তু এরপর কী বলবে , কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছিল না সে । অথচ বুকের মধ্যে ঢিপঢিপ করছিল , মনে হচ্ছিল তার পা কাঁপছে ---- যেন কত কথা তার বলার আছে , বলতে ইচ্ছে করছে , কিন্তু বলতে পারছে না বাইরে বৃষ্টি হয়ে চলছিল । অনেক ভেবে সুমন্ত জিজ্ঞেস করলো " কতদিন থাকবেন আপনারা ? " দশদিন " । চাঁপা অস্পষ্ট স্বরে বলেছিল । সুমন্তের খুব জানতে ইচ্ছে করছিল তার বুকের মধ্যে যেসব অচেনা অনুভূতি হচ্ছে , চাঁপার ও কি তাই হচ্ছে ? সুমন্ত লক্ষ্য করল চাঁপা তার শাড়ীর আঁচলের একটা কোণ বারবার আঙুলে জড়ানোর চেষ্টা করছে । সেটা যেন ঠিক হচ্ছে না ।এমন সময় হঠাৎ করে যেমন বৃষ্টি এসেছিল , তেমনি হঠাৎ করে আকাশ পরিষ্কার হয়ে গেল । সাময়িক আশ্রয় ছেড়ে সকলে ম্যালের কলধ্বনির মধ্যে মিশে গেল । সুমন্ত কে অবাক করে দিয়ে যাওয়ার আগে চাঁপা বলেছিল ,' চলি বৃষ্টি থেমেছে । আবার দেখা হবে । ' বিস্মিত সুমন্ত কোনও কথা বলতে পারে নি । কেবল ঘাড় নেড়ে সায় দিয়েছিল । সেদিন রাতেই সুমন্তের বন্ধুরা ঠিক করেছিল পরের দিন খুব ভোরে টাইগার হিল এ গিয়ে সূর্যোদয় দেখবে । ভোররাতে উঠে জিপে করে টাইগার হিল এ যাওয়াটা ও এক অভিজ্ঞতা । সেখানে ভোরের আবছা আলোয় চাঁপাদের দলটাকে দেখে সুমন্তের সমস্ত মন প্রাণ আনন্দে অধীর হয়ে উঠেছিল । কাঞ্চনজঙ্ঘার তুষারশীর্ষে উদীয়মান সূর্যরশ্মির সেই অনির্বচনীয় রঙবাহারের সৌন্দর্য ভাষায় প্রকাশ করা যায় না ।সেখানে মানুষের ভিড়ে ও সুমন্তের দৃষ্টি বারবার চাঁপার উপর ছিল । চাঁপা ও গোপন দৃষ্টিতে তাকে দেখছিল । কাঞ্চনজঙ্ঘার চূড়ায় সূর্য্যের রাঙা আভার প্রতিফলন চাঁপার মুখ দেখতে পেয়েছিল সুমন্ত । চাঁপা যেন তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসেছিল । সুমন্তের মনে হয়েছিল সেই হাসির তুলনায় সারা পৃথিবীর সমস্ত সৌন্দর্য তুচ্ছ , মহিমাময় হিমালয় ও যেন সেই হাসির সৌন্দর্যে দিশাহারা । এরপর ম্যালে অন্যদের চোখ এড়িয়ে চাঁপার সাথে বেশ কয়েকবার কথা হয়েছিল সুমন্তের । চাঁপারা আগে কোলকাতায় ফিরে গিয়েছিল । ওরা চলে যাওয়ার পর দার্জিলিংকে জনশূন্য মনে হচ্ছিল সুমন্তের ।দার্জিলিং -এ বসে থাকা যেন সময়ের অপচয় ।আগে থেকে ঠিক করে রাখা ভ্রমণসূচি পাল্টানোর অনুরোধ করতে তার লজ্জা করছিল । বন্ধুরা মনে করেছিল ভদ্র , বিনীত কবি স্বভাবের সুমন্ত প্রকৃতির শোভায় বাক্যহারা হয়ে পড়েছে । কোলকাতায় ফিরে সুমন্তের মনে হয়েছিল চাঁপার ঠিকানা তো সে জানে না ।পরে ভাবলো , জানা থাকলে ও তার কি সাহস আছে অচেনা বাড়িতে কড়া নেড়ে চাঁপা কে খোঁজ করার ? তার চেয়ে চাঁপা কে খুঁজে পাওয়ার সহজ পথ হচ্ছে প্রেসিডেন্সি কলেজ । ক্যালকাটা ইউনিভর্সিটি আর প্রেসিডেন্সি কলেজ কাছাকাছি । ওখান থেকেই চাঁপা কে খোঁজ করা যাবে । গরমের ছুটি তখনও শেষ হয়নি । ছুটির শেষ কদিন সুমন্ত তার গ্রামের বাড়িতে কাটালো । গ্রামের শান্ত পরিবেশে কোনও কিছুর প্রতি মনোনিবেশ করা সহজ , জীবনের তাড়া কম এবং একান্তে নিজেকে নিয়ে থাকার সুযোগ অনেক বেশি । মনে আছে সুমন্তের , কতদিন সন্ধ্যের পর সে তাদের বাড়ির পিছনের পুকুরের পাড়ে বাঁধানো ঘাটে শুয়ে জ্যোৎস্না ভরা আকাশের দিকে তাকিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দিয়েছে । অত অল্প সময়ের দেখা হলেও সুমন্ত যেন চোখ বন্ধ করে পরিষ্কার দেখতে পেয়েছে চাঁপা কে । চাঁপার মুখের ভাঁজ , চোখ , হাসি সব যেন ছবির মত তার চোখের সামনে ভেসে উঠেছে । মেয়েদের সম্বন্ধে উদাসীন সে মোটেই ছিল না কোনও দিন । কোনও পরিচিত মেয়ের নিবিড় সান্নিধ্য যে সে মনে মনে চায়নি বা কল্পনায় উপভোগ করেনি তাও নয় । কিন্তু সেই অনুভূতি কল্পনাতেই মিলিয়ে গেছে । তবে এবার চাঁপা কে নিয়ে তার যে অনুভূতি , তা আগেকার সব অনুভূতি থেকে আলাদা । এ যেন তার অতি একান্ত , অতি গোপন । চাঁপার কথা মনে হতে তার সারা দেহে -মনে যে জড়তা -সঙ্কোচ মেশানো ভালোলাগার একটা কম্পন ঢেউ খেলে উঠছে , তেমনটি আগে কখনও হয়নি । গরমের ছুটির শেষে আবার কলকাতায় সুমন্তের ছাত্র জীবন শুরু হল । তবে তার প্রথম কাজ ছিল চাঁপা কে খুঁজে বের করা । বেশ কয়েক দিন প্রেসিডেন্সি কলেজের বাইরে ছুটির সময় দাঁড়িয়ে থেকে শেষে পর্যন্ত একদিন সে দেখা পেল চাঁপার । চাঁপা কলেজ থেকে বেরিয়ে অন্যমনস্ক হয়ে পায়ে হেঁটে যাচ্ছিল । চাঁপা কে দূর থেকে দেখতে পেয়ে নিজের অজান্তেই সুমন্তের মুখ হাসিতে ভরে উঠলো ।অনুভবটা যেন পরম প্রাপ্তির স্বাদ । চাঁপার বই -খাতা , ব্যাগ হাতে অন্যমনস্কভাবে হেঁটে চলার ভঙ্গিটা দূর থেকে সুমন্তের খুব ভালো লাগছিল । সে বহুক্ষণ ধরে দূর থেকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে চাঁপার দিকে তাকিয়ে ছিল । দার্জিলিং এর পাহাড়ি পরিবেশে যাকে দেখেছে , কলকাতার কলরোলে তাকে আবার দেখার মধ্যে কোনও পার্থক্য সে খুঁজে পেল না । সেই এক লাজুক ভঙ্গি , সেই একই রকম কমনীয়তা । অনেক সাহস করে সুমন্ত জোরে হেঁটে চাঁপার কাছাকাছি চলে এল । প্রায় পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে তাকে জিজ্ঞেস করলো , ' চিনতে পারছেন ? ' চাঁপা প্রথমটায় চমকে উঠে এক পলক তাকে দেখে স্মিত হেসে জবাব দিল , ' পারছি । আপনি এখানে ? ' সুমন্তের মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল ' আপনাকে দেখতে । ' ইউনিভর্সিটিতে এসেছিলাম তাই ভাবলাম আপনার সাথে দেখা করি । বেশ কয়েকদিন ধরে আসছি কিন্তু আপনাকে দেখতে পাই নি । কথাটা বলেই সুমন্তের ভীষণ লজ্জা করল । ভাবল , কী ভাববে চাঁপা ! সে কি এমনি করে মেয়েদের দেখতে কলেজের পাশে দাঁড়িয়ে থাকে ? তাকে অবাক করে চাপা বলল , ' তাই ? ' চাঁপার প্রতিক্রিয়ায় সুমন্ত যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল । বলল , " আপনার একটু সময় হবে ? কোথাও বসে চা খেতাম । " চাঁপা একবার হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল ," চলুন " । সেই শুরু । এরপর বছর দুয়েক তাদের মেলামেশা পরিচয় কে গভীর বন্ধুত্বের আঙিনায় নিয়ে গেল । যদিও দু' জনেই জানত এই বন্ধুত্বের গতি তাদের কোন পথে নিয়ে চলেছে , বন্ধুত্বের গন্ডি পেরিয়ে কখন যে তারা প্রেমের জোয়ারে ভেসে গেল নিজেরাই বুঝতে পারলো না । ধীরে ধীরে সম্বোধন টা আপনি থেকে তুমিতে চলে এসেছে। সপ্তাহে অন্তত একবার দেখা না হলে কেউই থাকতে পারতো না । সুমন্ত Geography তে এম .এ পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণীতে পাশ করল । চাঁপা পাশ করল Bengali অনার্স । দ্বিতীয় শ্রেণীতে । সুমন্ত একটা নামী কলেজে অধ্যাপনায় যোগ দিল । চাঁপা পড়তে এল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে । সুমন্ত এরপর লন্ডনে পি .এইচ .ডি করার সুযোগ পেল । চাঁপা কে তা জানাতে সে বলেছিল , " খুব ভাল । নিশ্চয়ই যাবে । ফিরে এসে আর কলেজ নয় , সোজা ইউনিভর্সিটিতে তোমার অধ্যাপনার আসন পাকা হয়ে যাবে । " সুমন্ত বলেছিল , " তুমিও এম .এ করে চলে এসো , লন্ডনে । " চাঁপা বলল , " কেন ? " " সেটা তো আর ও ভালো হবে , " সুমন্ত বলেছিল । " সেখান থেকে ফিরে এসে তুমিও সোজা ইউনিভর্সিটিতে অধ্যাপনায় যোগ দেবে । " চাঁপা দুষ্টু হেসে বলেছিল , ' দুর , চাকরি করতে আমার ভাল লাগে না । ' অবাক হয়ে সুমন্ত জিজ্ঞেস করেছিল ' কেন ? ' তেমনি হাসিমুখে চাঁপা বলেছিল , " তার চেয়ে নিজের মত ছবি আঁকবো , গান গাইবো , লিখব । না হয় মন দিয়ে ঘর -সংসার করবো । " সুমন্ত হেসে বলেছিল , " ভারি সুগৃহিনী হওয়ার বাসনা তো ! "হাল্কা কথায় সেই সন্ধেটা চলে গেল । সুমন্তের মনে তখন উচ্চাশার ভিত শক্ত হয়ে দেখা দিয়েছে । তাকে বিদেশ যেতে হবে , পৃথিবী দেখতে হবে , নাম , অর্থ , প্রতিষ্ঠা পেতে হবে । ভাবল যাওয়ার আগে চাঁপাকে বলবে তাদের বন্ধুত্বের আবরণে গোপন রাখা প্রেমকে স্বীকৃতি দিতে , আর আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ের কথা বলবে । কখনো উত্থান কখনো পতন ।কখনো হাসি কখনো কান্না ,কখনো সুখ কখনো দুঃখ ।কখনো হারিয়ে যাবার ভয় ,কখনো আঁকড়ে ধরার চেষ্টা ।কখনো গতি হারা কখনো গতিতে চলা ।সময়ের কাছে হার মানতে হয় সবাই কে ।সুখ -দুঃখ ,হাসি -কান্না ক্ষনিকের ।আবার জীবনের গতি বাড়াতে হয় ।কখনো কখনো হার মানতে হয় নিয়তির কাছে ।তখন স্মৃতি টুকু শুধু মুচকি হাসে ।রয়ে যায় স্মৃতি পটে স্মৃতি ময় ছবি ।কখনো কখনো স্মৃতি টুকু ও বিলীন হয়ে যায় ।নিজেদের ব্যস্ত জীবনের কাছে ।
